Sunday, June 14, 2020

ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য (২)

সাধারণ লোকের একটি সরল ধারণা জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ বাস্তবে প্রয়োগ করলেই সমাজটা জেন্ডার বৈষম্যহীন হয়ে যাবে না।নারী পুরুষের বৈষম্য কমবে নাকিন্তু বৈষম্য তো প্রকাশিত হয় আচরণ এবং মনোভাবের মাধ্যমে। মনোভাব বুঝা যায় শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে।অনেক শব্দ নারীর মর্যাদা হানিকর।জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে নারীকে অধ:স্তন, অসম্মান ও অপমান করা হয়  এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে।তবে প্রতিরোধমূলক তেমন ব্যবস্থা নেই। আর এপ্রতিবাদে সাধারণ মানুষের সরল বুদ্ধি একমত হয় না কাজেই জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কারও আচরণ, কর্মসূচির কোন কৌশল পদক্ষেপ বা কোন নীতি জেন্ডার অসংবেদনশীল হলে এর প্রতিবাদ হয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য নীতি ও আইন হয়।

স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার প্রগতিশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য।শব্দ ব্যবহারে জেন্ডার সংবেদনশীলতা জেন্ডার বৈষম্য কমিয়ে আনার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ বুঝতে আমরা শ্রেণী বৈষম্যের বিষয় থেকে উদাহরণ দিতে পারি।বাড়ির চাকরকে এখন কেউ আর চাকর বা চাকরানি বলে না।বলে বুয়া।ঝি। মাসি।কিছুলোক অন্যের কাছে পরোক্ষভাবে পরিচয় দেয় কাজের লোক বলে। আরও সচেতনরা অন্যের কাছে পরোক্ষভাবে পরিচয় দেয় গৃহকর্মী বলেনিজের রুচির প্রকাশে গৃহকর্মীর এ পরিচয়। গৃহকর্মী(নারী হলেও ব্যাকরণের নিয়মে ইনী-প্রত্যয় প্রয়োগ করে গৃহকর্মিণী বলে না)বললে অর্থনৈতিক শোষণ আক্ষরিক অর্থে হয়তো কমে না, কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত শোষণ স্পষ্টতই কম অনুভূত হয়। এখন কোন গৃহকর্মীকে চাকর বললে সে গাট্টি প্যাটরা বেঁধে বিদায় নেবে।এখানে তার মর্যাদার প্রশ্ন।

নেকে সামনাসামনি গৃহ কর্মীও বলে না।বলে,আরে এ ইতো আমার ঘর সংসার চালায়। আমার এ মাসি বা মেয়ে না থাকলে আমার অবস্থা যে কি হতো!

চাকর বা চাকরানি, বুয়া এবং গৃহকর্মী শব্দের এ রুপান্তর কেন?

শ্রেণী বৈষম্যের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলেই জেন্ডার বৈষম্যে শব্দ প্রয়োগের বিষয়টিও মাথায় ঢুকবে।

কাজেই শব্দের দ্যোতনা শুধু কাব্যিক বিষয় নয়,সামাজিক মর্যাদারও বিষয়।অফিসের পিওন এখন ম্যাসেঞ্জার।কাজেই জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারও নারীর মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত।

আমি নারী।চমৎকার ছবি আঁকবো।আর আপনি বলবেন মহিলা চিত্রশিল্পী?  আপনি নভেরাকে ভাস্কর বলবেন না মহিলা ভাস্কর বলবেল?

একটি সভায়  জ্ঞান গর্ভ আলোচনায় অংশগ্রহণ কারীরা প্রত্যেকেই আলোচক। এখানে কে নর ও কে নারী বিষয়টি মুখ্য নয়। তার জৈবিক পরিচয় খুঁজে মহিলা আলোচক  হিসেবে পরিচয়  করানো  সভ্যতায় পড়ে না।

মারি কুরি যৌথভাবে দুই দুই বার যৌথ গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েও গবেষিকা আর স্বামী পিয়েরে কুরি একবার নোবেল পুরস্কার পেয়েও গবেষক ও বৈজ্ঞানিক। বিশুদ্ধ বৈয়াকরণগণের মতে মারি কুরি কি তবে স্ত্রীলিঙ্গ বৈজ্ঞানিকা”!   

বাবুর্চি তুর্কি ভাষার শব্দ?এর অর্থ পাচক। বিশুদ্ধ বৈয়াকরণগণ নারীর বেলায় বলেন পাচিকা।নারীর এ উপাধি কিন্তু রন্ধনশিল্পের দক্ষতার জন্য নয়, শুধুমাত্র তার দৈহিক গঠনের জন্য।রাঁধুনী বলতে নারী বুঝায়।ব্যকরণের ভাষায় এটি নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ।এর পুংলিঙ্গ কি রাঁধন করা যায় না?আমার কাছে বাবুর্চির চেয়ে রাঁধন শ্রুতি মধুর লাগছে। এক্ষেত্রে বিশুদ্ধ বৈয়াকরণগণের উত্তর আমার জানা নেই।

নেপথ্যে বলে রাখি--- আমি এসব পেশার বেলায় লিঙ্গান্তরে বিশ্বাসী না। ঈ-প্রত্যয়,নী- প্রত্যয়,আনী- প্রত্যয়,ইনী- প্রত্যয়,উন – প্রত্যয়,আইন- প্রত্যয় ব্যবহার পরিহার করে বেঙ্গম বেঙ্গমী, ভিখারী ভিখারিনী শব্দের যুগের পরিসমাপ্তি প্রয়োজন।

ইংরেজীতে chairman এর পরিবর্তে chairperson শব্দ ব্যবহার অনেক আগেই চালু হয়েছে।বাংলায় সভাপতি ও সভানেত্রী।কিন্তু আমাদের দেশে ইউনিয়ন পরিষদের chairperson পদে কোন নারী নির্বাচিত হলে বলা হয় মহিলা চেয়ারম্যান।চেয়ারম্যানের ম্যান শব্দটি চেয়ারের সাথে আঠা বা গাম দিয়ে লাগানো।তা থেকেই যায়।এ আঠা ছুটাতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নতুন শব্দ সৃষ্টি করা।

chairperson এর মতো বাংলায়ও এমন কিছু শব্দ ব্যবহার চালু আছে। যেমন পোশাক শিল্পে শ্রমিক (garments worker),গৃহকর্মী (house worker)। আরও আছে। 

কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে member নারী পুরুষ নির্বিশেষে। female member বাংলায় সদস্যা।এক্ষেত্রে সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য বলা উচিত। কারণ কোন নারী সংরক্ষিত আসনের বাইরে নির্বাচিত হলে উনি কি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যা বা female member মাত্র। সাধারণভাবে তো সদস্য ও সদস্যাদের(সংররক্ষিত আসনের মেম্বার)পোর্টফোলিও একটু আলাদা।

গ্রামীন সমাজে প্রচলিত ধারণা---- আরে! ইউনিয়ন পরিষদের বেডি মেম্বারগুলি কোন কামের না।কিচ্ছু বুঝে না।এখানে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহারের কি ছিরি!

সংরক্ষিত মহিলা আসনে পুরুষ মেম্বারের চেয়ে তিনগুণ বড় কর্ম এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে পাশ করে এসেও বেডি মেম্বার। কেউ কিন্তু বলে না ইউনিয়ন পরিষদের বেডা মেম্বারগুলি প্রায়ই সরকারি চাল গম চুরি করে।

ছেলে মানুষী কি আদুরে শব্দ!সাত খুন মাফ।ছেলে মানুষী করতে করতে নষ্টামি করলেও দুষ্টামি।তবুও ছেলে মানুষী।

মেয়ে মানুষ!কি তুচ্ছ উচ্চারণ!মেয়ে মানেই অধঃস্তনতা।মেয়ে মানুষের মতো কথা বলা। দুর্বল কথা।অপ্রাসঙ্গিক কথার চর্চা।

আমরা শৈশবে মাকে বলতাম, বান্ধবীর বাড়ি যাবো।কেন যাবো তা ঈ প্রমাণসহ বলতাম।মা অনুমোদন দিলে তবে যাওয়া। আর বন্ধুত্ব সামাজিক সংকীর্ণতার মেয়ের বন্ধু মেয়ে।অনার্সে পড়ার সময় ছেলে বন্ধু হয়েছে এবং এখনও--- ফেসবুক যুগ পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছেীখন মেয়েবলে, বন্ধুর সাহে দেখা করতেযাচ্ছি। সে বন্ধু ছেলে না মেয়ে এ প্রশ্ন অবান্তর। বন্ধুত্ব শব্দটি সামাজিক বলয়ে সম্প্রসারিত এবং বন্ধু শব্দটি লিঙ্গের শিকল থেকে মুক্ত।

শব্দ ব্যবহারে সচেতন হবার সময় বিগত।এখনই জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার শুরু হোক।

 যুগ পালটে গেছে।শব্দ এখন রুপ পাল্টিয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছে।

 


2 comments:

  1. সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে যেটি প্রয়োজন- এসংক্রান্ত একটি পরিভাষার গ্রন্থ রচনা করা যা কিনা সরকারি অনুমোদন লাভ করতে পারে। এছাড়া এটি কেবলমাত্র বিক্ষিপ্তভাবে ব্যবহৃত হবে, যা বর্তমানে চলছে। ধন্যবা।

    ReplyDelete
  2. সহজে বুঝার জন্য সুন্দর লেখা-অনেকের মধ্যে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনবে বলে আশা করছি!

    ReplyDelete