নারীর বিরুদ্ধে ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার
আমাদের চারপাশে বিরাজমান। এর মধ্যে বাংলাদেশে আদালত একটি
খন্ডন করেছে।শব্দটি ছিল ইভ টিজিং।
আমাদের চারপাশে এমন কোন মেয়ে ছিল না,এখনো নেই
যে ‘তথাকথিত’ ইভ টিজিং এর শিকার হয়নি। যেমন, স্কুলে যাওয়ার পথে একদল ছেলের পিছে পিছে যাওয়া। কারণ মফস্বলে
মেয়েরা হেঁটে বা রিকসায় স্কুলে যায়। মেয়ে দেখলে শিষ দে্যা। আগে প্রেম পত্র পাঠাতো।
এখন মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়।অযাচিতভাবে মেয়েদের
শরীর স্পর্শ করা,জোরে সেলফি তুলা। ইত্যাদি ইত্যাদি।মেয়ে পাঠক এ তালিকা দীর্ঘ
করতে পারবেন।
এক সময় অভিভাবকরা এসবকে যুব বয়সের রোমান্টিকতা
বলে ধরে হালকা ধমক ধামক দিয়ে মিটিয়ে ফেলতো।কিন্তু ২০০৯ -২০১০ এর দিকে বাংলাদেশে তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। যুবগোষ্ঠির রোমান্টিকতা যৌন হয়রানিতে রুপান্তরিত হয়। বখাটেদের কর্তৃক নারীরা যৌন হয়রানি অনেক মেয়ে
ও নারী সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে। ইভ টিজাররা এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠে যে তাদের
এসব অপকর্মে বাধা দিতে গিয়ে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন।
ইভ টিজিং এর নামে যৌন হয়রানি করেও কখনো কখনো একে নিছক
রসিকতা গণ্য করে অপরাধীরা দায় এড়াতে পেরেছে।এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী, নারীপক্ষসহ অনেক নারীবাদী সংগঠন ইভ টিজিংএর পরিবর্তে কোন
উপযুক্ত শব্দ প্রতিস্থাপনের দাবি জানায়।তাদের মতে হাওয়া(ইভ) বিবির পৌরাণিক কাহিনীর প্রসঙ্গ এনে ইভ শব্দের ব্যবহার নারীর আবেদনময়তাকে নির্দেশ করে। যে কারণে
উত্ত্যক্ত হওয়ার দোষ নারীর উপর বর্তায় আর পুরুষের আচরণ আগ্রাসনের পরিবর্তে
স্বাভাবিক হিসেবে ছাড় পায়।
২০১০ সালের ২ নভেম্বর সারা দেশে যৌন
হয়রানি রোধে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে জনস্বার্থে অ্যাডভোকেট ফাহিমা
নাসরিন মুন্নী একটি রিট দায়ের করেন। দীর্ঘদিন শুনানির পর আদালত কয়েক দফা
নির্দেশনাসহ রায় প্রদান করেন।
২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের হাই
কোর্ট ইভ টিজিং বা মেয়েদের উত্যক্ত করার বিষয়টিকে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচনা
করার নির্দেশ দিয়েছে।রায়ে বলে হয়েছে ইভ টিজিং শব্দটি
অপরাধের মাত্রা হালকা করে দেয়, এর পরিবর্তে সর্বস্তরে যৌন হয়রানি শব্দটি ব্যবহার
করতে হবে। এসএমএস, এমএমএস, ফোন ও ইমেইলের
মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করাও যৌন হয়রানির আওতায় আসবে।আমার এ লেখার
উদ্দেশ্য যৌন হয়রানির তালিকা প্রস্তুত নয়, বা রায়টির আইন সঙ্গত ব্যাখ্যা দেয়াও নয়।কাজেই এ নিয়ে আর শব্দ
ব্যয় করছি না।
হাওয়া(ইভ) বিবির পৌরাণিক কাহিনীর ইভ টিজিং শব্দ আদালতের
নির্দেশে পরিণত হলো যৌন হয়রানিতে।পৌরাণিক কাহিনীর ঘটনায় ইভ মানে নারী হাওয়া
প্রতারণার জন্য দায়ী। সে কাহিনী আধুনিক আদালত অপরাধীরাদের অপকর্মের জন্য এর
শব্দার্থ পালটে দিয়েছেন। শব্দের এ রুপান্তর রাষ্ট্র ও সমাজ মেনে নিয়েছে। নারীর
বিরুদ্ধে ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহারে পড়েছে নিষেধাজ্ঞা।
কাজেই এখন কোন
পাঠ্য বইয়ে হাওয়া বা ইভের কাহিনী অন্তর্ভুক্ত করলে এবং তা শিক্ষক ব্যাখ্যা করতে
গেলে শব্দের এ নারীবাদী রুপান্তর ব্যাখ্যা না করলে পাঠদান অসম্পূর্ণ থাকবে বৈ কি!
দুগ্ধদানকারী মা। Breastfeeding mother এর বাংলা করা হয়েছে দুগ্ধদানকারী মা। এ দুগ্ধদানকারী মা শব্দদ্বয় আমার পছন্দ
নয়। বিশেষ করে মায়ের সাথে দুগ্ধদানকারী কেন?
অপছন্দের কারণ সব সময় বুঝা যায় না।আবার অনেক সময় বুঝলেও প্রকাশের ভাষা থাকে
না।দুগ্ধদানকারী মা শব্দদ্বয় এবং সম্বোধনটি কেমন যেন গাভী গাভী লাগে। দুধেল
গাই।এটি হয়তো আমার অবচেতনে টোটেমবাদের প্রভাব।
টোটেমবাদের প্রভাবেই দুগ্ধদানকারী
মা বললে ছোট বেলায় শোনা কবলি গাইয়ের কথা মনে পড়ে।
ছোটবেলায় ঠাকুমাদের কাছে (মা,বাবা,কাকাদের কাছে সব সময় যে কোন
প্রয়োজনে পয়সা চাওয়ার আবদার অনুমোদন পেতো না।চাইতামও না।) পয়সা চাইলে বলতেন, আমি কি কবলি গাই, যে
চাইলেই পাবি। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী কবলি গাই থেকে
যখন ইচ্ছে তখন দুধ দুয়ানো যেতো। শৈশবে
আমাদের গ্রামে হিন্দু পাড়ায় অনেকের ঘরে মেলা থেকে
কেনা একটা ছবি ঝুলানো দেখেছি। পেছনটুকু দুধেল গাভীর এবং পাখাও আছে, আর সামনের মুখটুকু সুন্দরী
নারীর। যখন তখন যত ইচ্ছে দুধ দোয়ানো যেতো বলে দাদুর মুখে গল্প শুনেছি। এর প্রভাবেই
হয়তো দুগ্ধদানকারী মা শব্দটি আমার অপছন্দ।
এ নিয়ে সরকারী কর্মসূচি আছে। কিন্তু এর একটি যুৎসই
বাংলা শব্দ পাওয়া গেল না!
সংস্কৃতে দুগ্ধ, প্রাকৃতে দুদ্ধ ও বাংলায় দুধ।
দুগ্ধবতী মানে দুধ দেয় এমন, দুধালো।
দুগ্ধবতী দুগ্ধ দান করে।
বাংলা শব্দ যেখানে সহজ
লভ্য সেখানে সংস্কৃত শব্দ দিয়ে কর্মসূচির
নাম ভারাক্রান্ত করা কেন! আমজনতাকেও শব্দটি বুঝাতে হবে তো! অনুবাদের জন্য শব্দ বাছাই আমজনতার জন্য করতে হবে। কারণ কর্মসূচিটি আমজনতার মধ্যে সব চেয়ে অধঃস্তন প্রসূতি মা হলো লক্ষিত গোষ্ঠি। দুগ্ধদানকারী শব্দ সংস্কৃত থেকে নেয়া। কর্মসূচি হলো প্রাকৃতজনের জন্য। আর
দুগ্ধদানকারী মা বললে আমার মতো জেন্ডার মৌলবাদীর কানে বাজে ও মনে লাগে। দুগ্ধদানকারী মা না বলে কি বলা যায়? স্তন্যদাত্রী মা? শ্রুতিমধুর
হলেও আরও কঠিন হলো? কিন্তু
মাকে দুধেল গাই মনে হচ্ছে না। অথবা বুকের দুধ খাওয়ানো মা বললে সমস্যা কি! জানি
না! অন্যদিকে মাতৃদুগ্ধ বললে সংস্কৃত
শব্দের সমাহার থাকলে কানে বাজে না। মাতৃ ---- মা সংযুক্ত বলেই হয়তোবা।
শুধু টোটেমবাদের প্রভাবে নয়, আধুনিক
কবিতার মননেও দুগ্ধবতী শব্দটি নারী সত্ত্বায় আপন হয় না।
“বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের
দোহাই
দোহাই মাছ-মাংস
দুগ্ধবতী হালাল পশুর,
লাঙল জোয়াল
কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই
হৃদয়ের ধর্ম
নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।“ ( আল মাহমুদ)
No comments:
Post a Comment