রাজনীতির ভাষা, ভাষার রাজনীতি এবং ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার সমার্থক
নয়।
ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার এক জটিল
সমীকরণ।
রাজনীতির ভাষা বিশেষ করে এ উপমহাদেশের মানুষেরা সবাই
আমরা জানি। বাংলাভাষীদের রাজনীতির ভাষা
তো জনগণের আত্মস্থ। বাংলাদেশে কথা শুনলেই বুঝা যায় উনি কোন পার্টির নেতা। আওয়ামীলীগ? জামাত? বি এন পি? জাতীয় পার্টি?ভারতে,বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, সিপিএম
না কংগ্রেস তাও বুঝা যায়।
অন্যদিকে, ভাষার রাজনীতির
জনই পৃথিবীব্যাপী ইংরেজী ভাষার কদর ও আদর। ফ্রেঞ্চও কোলে কাঁখেই মানুষ।পরে
স্পেনিশ। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। উল্লেখিত তিনটি বাদেও রয়েছে রাশিয়ান,চাইনিজ ও আরবী।
এসব ভাষার অবস্থান রাজনীতির সুফল।যদিও যুক্তি দেয়---যে ভাষার দাপ্তরিক প্রয়োগ যত বেশি তার গুরুত্ব বেশি হিসেবে
ভাষার মান নির্ণয় হয়। এটাও রাজনৈতিক কৌশল।বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের ভাষা করার জন্য সাক্ষরতা অভিযান শুরু
হয়েছিল। কিন্তু ভাষা রাজনীতিতে ফসল ঘরে তোলা যায়নি।একুশে ফেব্রুয়ারি তো ভাষা
নিয়ে রাজনীতিরই সাক্ষী।ভারতে হাজার
ভাষার ভিড়ে হিন্দি রাজ সিংহাসনে। তবে অন্যান্য ২১টি ভাষা নিজেদের ঘরে ঠাকুর সিংহাসন গড়ে নিয়েছে।বাংলাদেশে প্রায় চল্লিশটি ভাষার মধ্যে
অন্য সব ভাষারা বাংলা ভাষার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে হাতজোড় করে হাঁটু গেড়ে বসা।
কিন্তু ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার নারীর জীবনে এক অমোঘ অভিশাপ।নারীর যথাযথ পরিচয় সংশায়িত।
নারী অস্তিত্ত্বের সংকটে দোলায়িত।
একটি
গল্প থেকে----
“বিয়ের পরপরই ধাক্কা খায়
সুজলা। পাশের বাড়ির হেড মাষ্টারবাবুর বউ এস এস সি পরীক্ষায় ফেল করে গৃহিণী হয়েও বড় মাষ্টারণী আর
সুজলা নিজে উচ্চ বিদ্যালয়ের বি এস সি শিক্ষক হয়েও ছোট মাষ্টারণী। প্রথম প্রথম
বিষয়টি তার কানে বিঁধত। এখন কান সইয়ে নিলেও মন পারে না।”
সহজেই অনুমেয় যে
এখানে শিক্ষকতা না করেও বড় মাস্টারণী। মাস্টা্র পুংলিঙ্গ ও মাস্টারণী স্ত্রী লিঙ্গ। একজন
মাস্টারের আক্ষরিক অর্থে স্ত্রী হয়ে স্ত্রীবাচকশব্দ মাস্টারণী। অন্যজন
স্বপরিচয়ে মাস্টার হয়েও মাস্টারণী।এ দুজনের পার্থক্য কীভাবে করা? এখানে কোন ধরণের লিঙ্গান্তর প্রযোজ্য? উচ্চ বিদ্যালয়ের বি এস সি শিক্ষক পরিচিতির সংকটে নিমজ্জিত।বৃত্তি বা পেশাগত পরিচিতির সাথে
স্ত্রীবাচক শব্দ প্রয়োগের ফলে সংঘর্ষের জন্য বৈয়াকরণগণ দায়ী নয় কি?
এরকম শতেক উদাহরণ দেয়া যাবে। একজন পেশাগত পরিচয়ে চিকিৎসক হয়ে ডাক্তারনী আর অন্যজন একজন
ডাক্তারের স্ত্রী হয়ে ডাক্তারনী। প্রত্যন্ত গ্রামে গোয়ালার স্ত্রী গোয়ালিনী।গরুর দুধ নিজে দুইয়ে বাজারে নিয়ে গেলেও গোয়ালিনী, এ সব কাজ না করলেও গোয়ালার স্ত্রী গোয়ালিনী।তেমন--
জেলে জেলেনী, কুমার কুমারনী,কামার কামরানী ইত্যাদি ইত্যাদি।
এর চর্চা আমাদের গ্রাম, শহর, শিক্ষিত,
নিরক্ষর সর্বত্র বিরাজমান। জেলা শহরে ডি সি ভাবী, এস পি ভাবী।মানে ডেপুটি কমিশনার মহোদয়ের স্ত্রী ও পুলিশ সুপার মহোদয়ের স্ত্রী। লেখকের স্ত্রী লেখক ভাবী বা লেখিকায় রুপান্তরিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে
না।
নারীর অবস্থা যাই হোক,অবস্থান অপরিবর্তিত। মাস্টারণী, ডাক্তারনী, জেলেনী, কুমারনী,গোয়ালিনী আর কামারনীর অবস্থা ভিন্ন হলেও
অবস্থান এক বিন্দুতেই বিলীন।পুরুষতান্ত্রিক সমাজ
কাঠামোতে নারীর অবস্থা ও অবস্থানগত এ পরিচিতি ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহারের উদাহরণ। বি এস সি শিক্ষক নারী ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহারের
শিকার।
সাহিত্য মানুষকে মানবিক করে তুলে। আনন্দে রাখে। সংবেদনশীল করে। নিজের একটি
জগত সৃষ্টিতে সহায়তা করে। অসাম্প্রদায়িক করে।সাহিত্য মানুষকে মানুষ ভাবতে
শেখায়। এসব মেনে নিয়েই ইদানিংকালে ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহারের নমুনা দিচ্ছি ---
"তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি
মোর অপরাধ" অথবা
"ও কেন এত সুন্দরী হলো দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই" এসব
অমোঘ প্রেমের পংক্তি আজকাল উত্যক্তকরণে
ব্যবহৃত হয়। নারীর প্রতি নিজের প্রলুব্ধকরণের মাছ ঢাকতে এসব কাব্যিক সুষমাকে শাক
হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নারী হয় নির্যাতনের শিকার।
মা তোরে বেইচ্চালামু।
কি কস, বাজান! আমারে বেইচ্চা লাবি! মাইনষে মা বেইচ্চালায়?
আরে মা, এমুন দাম চামু, তরে কিনব কোন বেডায়?(বেডায়ই, কারণ বেডিদের ক্রয় ক্ষমতা
সীমিত।তাই লোককথা, শ্রুতি বা প্রবাদ প্রবচনেও তা প্রতিফলিত)
ভাষায় লিঙ্গ বৈষম্য ঘোচানো এমনই মা বেচে
ফেলার মতো দামী।এমন অযৌক্তিক যুক্তি
দেয়া হবে যে তা খন্ডন করবে কে?
নারী তোমায় স্বাধীনতা দিব।কোন কোন ক্ষেত্রে? সর্বজনস্বীকৃত উত্তর--সম্পদে ও সিদ্ধান্তে। আওয়াজ তোলার
সময় বিগত যে নারীকে নিয়ে শব্দ প্রয়োগ ও ভাষা
ব্যবহারেও সচেতন,
সজাগ ও সংবেদদনশীল হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। ভাষায় লিঙ্গ
বৈষম্য ঘোচানোই তো এক ধরণের আন্দোলন।
তুমি নারী।
ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশল বিদ্যায় পড়বে? পড়ো। তবে তুমি পাশ করে চাকরি করলেও তোমাকে শুধু
প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ার বলবো না। তুমি মহিলা প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ার।(যাক,প্রকৌশলীনি
যে বলবে না তাতেই কি খুশি থাকা উচিত?)
চাকরির জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং কোন পদে পরীক্ষা দেবে। ভালো করতে
পারলে চাকরি হবে। তোমার নিয়োগ পত্রে ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী লেখা থাকবে। কিন্তু
শুদ্ধাচারী বৈয়াকরণগণ তোমাকে ব্যাকরণ বইয়ে বলবে মহিলা প্রকৌশলী।
কিছু ছিঁদ কাঁদুনে নারীরা বলবে এ শব্দই তো
যথাযথ। মহিলা প্রকৌশলী। মহিলার অস্তিত্ত্ব পদের সাথে লেপ্টে আছে। শুধু প্রকৌশলী বললে
তো নারীর অস্তিত্ত্ব বিলীন হয়ে যাবে। ভালোই তো আমরা--- মহিলারাও যে প্রকৌশলী
হতে পারি এর প্রমাণ। আমাদেরও যে মেধা আছে—এর উদাহরণ। উল্লেখিত
পদে যে একজন মহিলা চাকরি করছে এ তো গর্বের বিষয়। জানান দিতে হবে না? বেশ বেশ।
আসলে প্রথাগত
ধারণা পোষণ করা থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং পদের চেয়ারটি পুরুষের জন্য আবাহনমান কাল ধরে
নির্ধারিত। ঐ পদে একজন নারী বসে নিজেকে প্রকৌশলী না বলে আগে মহিলা বলবেন। কী মজার
প্রস্তাব!নারী যে কোন পদের সাথে তার শারিরীক গঠন জুড়ে দিয়ে অস্থিত্ত্ব জাহির করবে। ইঞ্জিনিয়ারিং
পদটি
ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ কোন মানুষের জন্য নয়? এটি কি পুরুষদের জন্য সৃষ্ট? কী উদ্ভট ভাবনা।
এ ছিঁদকাদুনে কিছু মানুষ বলে, নারী যে পদেই থাকুক স্ত্রীবাচক
শব্দ ছাড়া তার পরিচয় অসম্পূর্ণ এবং স্ত্রীবাচক শব্দ ছাড়া নারী অফিসে, আদালতে, সংসদে
পরিচিত হলে সব স্ত্রীবাচক শব্দের অস্তিত্ত্ব বিলীন হয়ে যাবে এবং তা নারীর জন্য অবমাননাকর।
কিন্তু তারা ভুলে যায় যে একজন নারী অফিসে ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী। বাবা মায়ের কাছে কন্যা।স্বামীর পাশে স্ত্রী। সন্তানের
কাছে মা।ভাইয়ের কাছে বোন। ঠিক এর বিপরীতে
একজন পুরুষ অফিসে ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী। বাবা মায়ের কাছে পুত্র।বোনের কাছে ভাই। স্ত্রীর পাশে
স্বামী। সন্তানের কাছে বাবা। এখানে প্রাকৃতিক লিঙ্গান্তর নিয়ে কোন দ্বন্ধ নেই।
দিদি পুরোটা পড়লাম। সত্যি এতটা নিগূঢ় ভাবে কখনও চিন্তা করি নাই। এটা আমার চিন্তার খোরাক জোগাল। ভাল লাগলো।
ReplyDeleteদিদি পুরোটা পড়লাম। সত্যি এতটা নিগূঢ় ভাবে কখনও চিন্তা করি নাই। এটা আমার চিন্তার খোরাক জোগাল। ভাল লাগলো।
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDeleteলেখাটি পড়া হয়েছে ,লেখক-এর সকল কথাই যুক্তিযুক্ত । কিন্তু কথা হচ্ছে, সেই কথাগুলো লেখার সঙ্গে সঙ্গে লেখকের নিজস্ব মতামত অর্থাৎ কোন শব্দের বেলায় কোনটা হলে ভালো হয়, তা বলা দরকার। তাহলে পাঠক সহজেই তাঁর মতামত পক্ষে/বিপক্ষে দিতে পারবেন। ধন্যবাদ।
ReplyDelete