Sex ও Gender শব্দ নিয়ে, শব্দ দুটোর মূল ধারণা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মৌলিক ব্যাখ্যা আছে।Sex হলো প্রাকৃতিক লিঙ্গ এবং Gender হলো সামাজিক লিঙ্গ। ব্যাকরণ বইয়ে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক শব্দ নিয়ে যে লিঙ্গান্তর তা প্রাকৃতিক লিঙ্গান্তর। আর আমি যা পরিবর্তনের কথা বলছি তা সামাজিক লিঙ্গান্তর। জেন্ডার নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র ব্যাপক ও গভীর। পৃথিবীর বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে বিভাগ আছে।লোকজন জেন্ডারের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করছে। ডিগ্রী নিচ্ছে।আমি শুধু মাত্র ভাষায় জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করছি।
যাদের Sex ও Gender নিয়ে মৌলিক ধারণা নেই তাদেরকে Sex ও Gender নিয়ে মৌলিক জ্ঞান দেয়ার জন্য আমার এ লেখা নয়। তাদের মন্তব্য বড্ড যুক্তিহীন লাগে। প্রথম অংশ পোস্ট দেয়ার সময় এ নিয়ে ভূমিকা দেয়ার পরও মন্তব্যে যুক্তিবিহীন একই ধরণের চর্বিত চর্বণের প্রতি উত্তর দিতে আমার মহা মূল্যবান অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করতে বাধ্য হয়েছি।
হ্যাঁ, আমার লেখার সাথে দ্বিমত করা, প্রশ্ন করা, স্বমত করা স্বাগতম। কারণ আপনাদের প্রশ্ন, দ্বিমত,স্বমতের ছোট্ট একটা শব্দ ও বাক্যে আমি আরো লেখার উৎস খুঁজে পাই।
বিশেষ করে দ্বিমত আছে বলেই আমার এ লেখা।আমার লেখা পড়ে একজনও যদি এ ধারণায় উদ্ধুদ্ধ হয় তা ই বা কম কিসে? আর যারা দ্বিমত পোষণ করে তাদের মতো অযুত কোটি লোকের সচেতনতার জন্যই এ লেখা। তবে দয়া করে একই বাক্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার মন্তব্যে লিখবেন না।
লুচ্চা বিপরীতে বলা হয় ছিনাল।তবে ব্যাকরণে এ লিঙ্গান্তর না থাকলেও সমাজে আছে।কারণ ভাষার সাথে ব্যাকরণ বই নয়,সমাজ সম্পর্কিত। আমাদের কথাই বৈয়াকরণগণ ব্যাকরণে ফেলেন।
একজন নিরক্ষর লোক বলতে পারে , লুচ্চা বেডা কুমতলব লইয়া বৃষ্টির মইধ্যে সইন্ধ্যাবালা উত্তরপাড়ায় ঘোরাফেরা করতাছে ক্যারে?
লুচ্চাডা কুমতলব লইয়া বৃষ্টির মইধ্যে সইন্ধ্যাবালা উত্তরপাড়ায় ঘোরাফেরা করতাছে ক্যারে? এটাও বোধগম্য।
অন্য আরেক নিরক্ষর লোক প্রতি উত্তর করতে পারে, যাইব না! ঐ পাড়ার ছিনাল বেডিডা অই লুইচ্চার কাছতে মাসে মাসে হাজার ট্যাহা নেয়।
ঐ পাড়ার ছিনালডা অই লুইচ্চার কাছতে মাসে মাসে হাজার ট্যাহা নেয়।
বেডা বা বেডি না বললেও হতো। কারণ লুচ্চা মানেই পুরুষবাচক শব্দ আর ছিনাল মানেই স্ত্রীবাচক।
লুচ্চাটা কুমতলব লইয়া ভাদরো মাইয়া দিন বৃষ্টির মইধ্যে সইন্ধ্যাবালা উত্তরপাড়ায় ঘোরাফেরা করতাছে ক্যারে?
ভাদরো মাইয়া দিন বললে বুঝি লুচ্চা কুত্তাডা, বেডাডা নয়। তবে বেডাও বটে, পুরুষ কুকুরটাই।
এখানে স্ত্রীবাচক ও পুরুষবাচক শব্দ নিয়ে নিরক্ষর লোকজনের ভাবনা নেই। এখানে কথা বলার সময় কোন কারক, কোন বিভক্তি তা ও বিবেচ্য নয়।কোন শব্দের কি লিঙ্গান্তর হবে তা ও কখনও শুনেনি। মনের ভাব শুদ্ধরূপে প্রকাশ হলো কি না তা বিবেচ্য। শুদ্ধরূপে প্রকাশ করা হয়েছে বলেই আমরা বুঝতে পেরেছি। ব্যঞ্জনাসহ বুঝতে পেরেছি। শুদ্ধরূপে বলতে ব্যাকারণের শুদ্ধতা নয়।
এসব নিয়ে ভাষাবিদরা ভাববেন। সাহিত্যতিকদের না ভাবাই ভালো।
আবার একই শব্দ দিয়ে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক দুটোই বুঝানো যায়। যেমন বদ ব্যক্তি। বদ মানুষ। এখানে বদ লোক ও বদ স্ত্রীলোক বলার দরকার নেই। বৈয়াকরণগণের মতে লোক পুংলিঙ্গ বা পুরুষবাচক ও স্ত্রীলোক হলো স্ত্রীলিঙ্গ বা স্ত্রীবাচক শব্দ। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ পল্টন ময়দানে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়েছিল। এর মানে কিন্তু শুধু পুরুষ লোক নয়?
এ নিয়ে বৈয়াকরণগণের ঐতিহাসিকদের সাথে সভা করা প্রয়োজন।
"রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।"
লোকের বা মানুষের এ অরণ্যও নারী-পুরুষের সমাগমে। বৈয়াকরণগণের কবিদের বিরূদ্ধেও স্লোগান দিতে হবে।
লোকের বা মানুষের এ অরণ্যও নারী-পুরুষের সমাগমে। বৈয়াকরণগণের কবিদের বিরূদ্ধেও স্লোগান দিতে হবে।
কাজী সাফিউন্নেসা নামে এক পাঠক জানিয়েছেন, “ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী নিজের নামের আগে কখনও "অধ্যাপিকা" ব্যবহার করতেন না ৷ তাঁর মত- পদগুলিতে লিঙ্গের বিভাজন যাতে না থাকে ৷ অধ্যাপক 'পুং শব্দ' হিসেবে ব্যবহার হোক এটা উনি চাইতেন না৷”
এর উত্তর এ হয় না যে তাহলে উনার নাম সুমিতা না হয়ে সুমিত হলো না কেন? সুমিতা চক্রবর্তী শাড়ি পড়েন কেন? নারী বলেই তো! কাজেই সুমিত যখন হয়নি এবং শাড়ি যখন পরেন তখন অধ্যাপক হওয়া যাবে না। উনাকে অধ্যাপিকা পদবীই ব্যবহার করা উচিত। করতে হবে।কী হাস্যকর যুক্তি।
সুমিতা চক্রবর্তী শাড়ি পরেন বলে উনার শাড়ির নীচের শারিরিক গঠন নিয়ে উনার বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক পদবী অধ্যাপিকা হতে হবে। উপাচার্য হবেন উপাচার্যা?কি ঠুনকো ও অশ্লীল কথা। মা বাবা উনার নাম সুমিত রাখতেই পারতেন। যেমন-- কারো নাম সীতা রাম।মহাকাব্য রামায়ণর চরিত্র অনুযায়ী পুরুষ ও স্ত্রী বাচক দুটো শব্দই আছে। তাতে সমস্যা কী? উনি তৃতীয় লিঙ্গেরও নন। সীতারামের মা বাবাকে বৈয়াকরণগণ কী বলবেন?
মহাকাব্য রামায়ণে সীতা নারী চরিত্র। । আর প্রবাদ আছে, সাত কান্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ। অর্থাৎ বোধহীন মানুষের উদাহরণ। সমাজের সাধারণ মানুষও জানে রামায়ণে সীতা বলতে এক নারী চরিত্র।বাপ বা পুরুষ হওয়ার কথা নয়।অথচ অনেক অজ্ঞানীরা সাত কান্ড রামায়ণ পড়েও জানেন না সীতা পুরুষ না নারী!তাই বলে বাস্তবে সব সীতা নামের ব্যক্তি যে নারী ই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।এখানে বৈয়াকরণগণের লিঙ্গের নিশ্চয়তা কোথায়?
আরেকটা সবিনয় প্রশ্ন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ায়, গান গায়, লেখে,রাঁধে তাদের পদবী কি হবে?
এ প্রসঙ্গে সুকান্ত ভট্টাচার্যের মেয়েদের পদবী নামে একটা পদ্য মনে পড়ে গেল!
মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী,
অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি;
‘আ’কার অন্ত দিয়ে মহিলা করার
চেষ্টা হাসির। তাই ভূমিকা ছড়ার।
‘গুপ্ত’ ‘গুপ্তা’ হয় মেয়েদের নামে,
দেখেছি অনেক চিঠি, পোষ্টকার্ড খামে।
সে নিয়মে যদি আজ ‘ঘোষ’ হয়‘ঘোষা’
তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা,
‘পালিত’ ‘পালিতা’ হলে ‘পাল’ হলে ‘পালা’
নির্ঘাৎ বাড়বেই মেয়েদের জ্বালা;
‘মল্লিক’ ‘মল্লিকা’, ‘ দাস’ হলে‘দাসা’
শোনাবে পদবীগুলো অতিশয় খাসা;
‘কর’ যদি ‘করা’ হয়, ‘ধর’ হয় ‘ধরা’
মেয়েরা দেখবে এই পৃথিবীটা-“সরা”।
‘নাগ’ যদি ‘নাগা’ হয় ‘সেন’ হয়‘সেনা’
বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা।।
আসলে প্রয়োজন জেন্ডার ব্লেন্ডার (Gender Blender)।
No comments:
Post a Comment