Friday, June 19, 2020

ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য (৩)

Sex ও Gender শব্দ নিয়ে, শব্দ দুটোর মূল ধারণা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মৌলিক ব্যাখ্যা আছে।Sex হলো প্রাকৃতিক লিঙ্গ এবং Gender হলো সামাজিক লিঙ্গ। ব্যাকরণ বইয়ে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক শব্দ নিয়ে যে লিঙ্গান্তর তা প্রাকৃতিক লিঙ্গান্তর। আর আমি যা পরিবর্তনের কথা বলছি তা সামাজিক লিঙ্গান্তর। জেন্ডার নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র ব্যাপক ও গভীর। পৃথিবীর বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে বিভাগ আছে।লোকজন জেন্ডারের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করছে। ডিগ্রী নিচ্ছে।আমি শুধু মাত্র ভাষায় জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করছি।
যাদের Sex ও Gender নিয়ে মৌলিক ধারণা নেই তাদেরকে Sex ও Gender নিয়ে মৌলিক জ্ঞান দেয়ার জন্য আমার এ লেখা নয়। তাদের মন্তব্য বড্ড যুক্তিহীন লাগে। প্রথম অংশ পোস্ট দেয়ার সময় এ নিয়ে ভূমিকা দেয়ার পরও মন্তব্যে যুক্তিবিহীন একই ধরণের চর্বিত চর্বণের প্রতি উত্তর দিতে আমার মহা মূল্যবান অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় করতে বাধ্য হয়েছি।

হ্যাঁ, আমার লেখার সাথে দ্বিমত করা, প্রশ্ন করা, স্বমত করা স্বাগতম। কারণ আপনাদের প্রশ্ন, দ্বিমত,স্বমতের ছোট্ট একটা শব্দ ও বাক্যে আমি আরো লেখার উৎস খুঁজে পাই।
বিশেষ করে দ্বিমত আছে বলেই আমার এ লেখা।আমার লেখা পড়ে একজনও যদি এ ধারণায় উদ্ধুদ্ধ হয় তা ই বা কম কিসে? আর যারা দ্বিমত পোষণ করে তাদের মতো অযুত কোটি লোকের সচেতনতার জন্যই এ লেখা। তবে দয়া করে একই বাক্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার মন্তব্যে লিখবেন না।

লুচ্চা বিপরীতে বলা হয় ছিনাল।তবে ব্যাকরণে এ লিঙ্গান্তর না থাকলেও সমাজে আছে।কারণ ভাষার সাথে ব্যাকরণ বই নয়,সমাজ সম্পর্কিত। আমাদের কথাই বৈয়াকরণগণ ব্যাকরণে ফেলেন।
একজন নিরক্ষর লোক বলতে পারে , লুচ্চা বেডা কুমতলব লইয়া বৃষ্টির মইধ্যে সইন্ধ্যাবালা উত্তরপাড়ায় ঘোরাফেরা করতাছে ক্যারে?
লুচ্চাডা কুমতলব লইয়া বৃষ্টির মইধ্যে সইন্ধ্যাবালা উত্তরপাড়ায় ঘোরাফেরা করতাছে ক্যারে? এটাও বোধগম্য।
অন্য আরেক নিরক্ষর লোক প্রতি উত্তর করতে পারে, যাইব না! ঐ পাড়ার ছিনাল বেডিডা অই লুইচ্চার কাছতে মাসে মাসে হাজার ট্যাহা নেয়।
ঐ পাড়ার ছিনালডা অই লুইচ্চার কাছতে মাসে মাসে হাজার ট্যাহা নেয়।
বেডা বা বেডি না বললেও হতো। কারণ লুচ্চা মানেই পুরুষবাচক শব্দ আর ছিনাল মানেই স্ত্রীবাচক।
লুচ্চাটা কুমতলব লইয়া ভাদরো মাইয়া দিন বৃষ্টির মইধ্যে সইন্ধ্যাবালা উত্তরপাড়ায় ঘোরাফেরা করতাছে ক্যারে?
ভাদরো মাইয়া দিন বললে বুঝি লুচ্চা কুত্তাডা, বেডাডা নয়। তবে বেডাও বটে, পুরুষ কুকুরটাই।
এখানে স্ত্রীবাচক ও পুরুষবাচক শব্দ নিয়ে নিরক্ষর লোকজনের ভাবনা নেই। এখানে কথা বলার সময় কোন কারক, কোন বিভক্তি তা ও বিবেচ্য নয়।কোন শব্দের কি লিঙ্গান্তর হবে তা ও কখনও শুনেনি। মনের ভাব শুদ্ধরূপে প্রকাশ হলো কি না তা বিবেচ্য। শুদ্ধরূপে প্রকাশ করা হয়েছে বলেই আমরা বুঝতে পেরেছি। ব্যঞ্জনাসহ বুঝতে পেরেছি। শুদ্ধরূপে বলতে ব্যাকারণের শুদ্ধতা নয়।
এসব নিয়ে ভাষাবিদরা ভাববেন। সাহিত্যতিকদের না ভাবাই ভালো।

আবার একই শব্দ দিয়ে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক দুটোই বুঝানো যায়। যেমন বদ ব্যক্তি। বদ মানুষ। এখানে বদ লোক ও বদ স্ত্রীলোক বলার দরকার নেই। বৈয়াকরণগণের মতে লোক পুংলিঙ্গ বা পুরুষবাচক ও স্ত্রীলোক হলো স্ত্রীলিঙ্গ বা স্ত্রীবাচক শব্দ। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ পল্টন ময়দানে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়েছিল। এর মানে কিন্তু শুধু পুরুষ লোক নয়?
এ নিয়ে বৈয়াকরণগণের ঐতিহাসিকদের সাথে সভা করা প্রয়োজন।

"রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।"
লোকের বা মানুষের এ অরণ্যও নারী-পুরুষের সমাগমে। বৈয়াকরণগণের কবিদের বিরূদ্ধেও স্লোগান দিতে হবে।

কাজী সাফিউন্নেসা নামে এক পাঠক জানিয়েছেন, “ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী নিজের নামের আগে কখনও "অধ্যাপিকা" ব্যবহার করতেন না ৷ তাঁর মত- পদগুলিতে লিঙ্গের বিভাজন যাতে না থাকে ৷ অধ্যাপক 'পুং শব্দ' হিসেবে ব্যবহার হোক এটা উনি চাইতেন না৷”
এর উত্তর এ হয় না যে তাহলে উনার নাম সুমিতা না হয়ে সুমিত হলো না কেন? সুমিতা চক্রবর্তী শাড়ি পড়েন কেন? নারী বলেই তো! কাজেই সুমিত যখন হয়নি এবং শাড়ি যখন পরেন তখন অধ্যাপক হওয়া যাবে না। উনাকে অধ্যাপিকা পদবীই ব্যবহার করা উচিত। করতে হবে।কী হাস্যকর যুক্তি।

সুমিতা চক্রবর্তী শাড়ি পরেন বলে উনার শাড়ির নীচের শারিরিক গঠন নিয়ে উনার বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক পদবী অধ্যাপিকা হতে হবে। উপাচার্য হবেন উপাচার্যা?কি ঠুনকো ও অশ্লীল কথা। মা বাবা উনার নাম সুমিত রাখতেই পারতেন। যেমন-- কারো নাম সীতা রাম।মহাকাব্য রামায়ণর চরিত্র অনুযায়ী পুরুষ ও স্ত্রী বাচক দুটো শব্দই আছে। তাতে সমস্যা কী? উনি তৃতীয় লিঙ্গেরও নন। সীতারামের মা বাবাকে বৈয়াকরণগণ কী বলবেন?
মহাকাব্য রামায়ণে সীতা নারী চরিত্র। । আর প্রবাদ আছে, সাত কান্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ। অর্থাৎ বোধহীন মানুষের উদাহরণ। সমাজের সাধারণ মানুষও জানে রামায়ণে সীতা বলতে এক নারী চরিত্র।বাপ বা পুরুষ হওয়ার কথা নয়।অথচ অনেক অজ্ঞানীরা সাত কান্ড রামায়ণ পড়েও জানেন না সীতা পুরুষ না নারী!তাই বলে বাস্তবে সব সীতা নামের ব্যক্তি যে নারী ই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।এখানে বৈয়াকরণগণের লিঙ্গের নিশ্চয়তা কোথায়?
আরেকটা সবিনয় প্রশ্ন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ায়, গান গায়, লেখে,রাঁধে তাদের পদবী কি হবে?
এ প্রসঙ্গে সুকান্ত ভট্টাচার্যের মেয়েদের পদবী নামে একটা পদ্য মনে পড়ে গেল!
মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী,
অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি;
‘আ’কার অন্ত দিয়ে মহিলা করার
চেষ্টা হাসির। তাই ভূমিকা ছড়ার।
‘গুপ্ত’ ‘গুপ্তা’ হয় মেয়েদের নামে,
দেখেছি অনেক চিঠি, পোষ্টকার্ড খামে।
সে নিয়মে যদি আজ ‘ঘোষ’ হয়‘ঘোষা’

তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা,
‘পালিত’ ‘পালিতা’ হলে ‘পাল’ হলে ‘পালা’
নির্ঘাৎ বাড়বেই মেয়েদের জ্বালা;
‘মল্লিক’ ‘মল্লিকা’, ‘ দাস’ হলে‘দাসা’
শোনাবে পদবীগুলো অতিশয় খাসা;
‘কর’ যদি ‘করা’ হয়, ‘ধর’ হয় ‘ধরা’
মেয়েরা দেখবে এই পৃথিবীটা-“সরা”।
‘নাগ’ যদি ‘নাগা’ হয় ‘সেন’ হয়‘সেনা’
বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা।।
আসলে প্রয়োজন জেন্ডার ব্লেন্ডার (Gender Blender)।

Sunday, June 14, 2020

ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য (২)

সাধারণ লোকের একটি সরল ধারণা জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ বাস্তবে প্রয়োগ করলেই সমাজটা জেন্ডার বৈষম্যহীন হয়ে যাবে না।নারী পুরুষের বৈষম্য কমবে নাকিন্তু বৈষম্য তো প্রকাশিত হয় আচরণ এবং মনোভাবের মাধ্যমে। মনোভাব বুঝা যায় শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে।অনেক শব্দ নারীর মর্যাদা হানিকর।জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে নারীকে অধ:স্তন, অসম্মান ও অপমান করা হয়  এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে।তবে প্রতিরোধমূলক তেমন ব্যবস্থা নেই। আর এপ্রতিবাদে সাধারণ মানুষের সরল বুদ্ধি একমত হয় না কাজেই জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কারও আচরণ, কর্মসূচির কোন কৌশল পদক্ষেপ বা কোন নীতি জেন্ডার অসংবেদনশীল হলে এর প্রতিবাদ হয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য নীতি ও আইন হয়।

স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার প্রগতিশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য।শব্দ ব্যবহারে জেন্ডার সংবেদনশীলতা জেন্ডার বৈষম্য কমিয়ে আনার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ বুঝতে আমরা শ্রেণী বৈষম্যের বিষয় থেকে উদাহরণ দিতে পারি।বাড়ির চাকরকে এখন কেউ আর চাকর বা চাকরানি বলে না।বলে বুয়া।ঝি। মাসি।কিছুলোক অন্যের কাছে পরোক্ষভাবে পরিচয় দেয় কাজের লোক বলে। আরও সচেতনরা অন্যের কাছে পরোক্ষভাবে পরিচয় দেয় গৃহকর্মী বলেনিজের রুচির প্রকাশে গৃহকর্মীর এ পরিচয়। গৃহকর্মী(নারী হলেও ব্যাকরণের নিয়মে ইনী-প্রত্যয় প্রয়োগ করে গৃহকর্মিণী বলে না)বললে অর্থনৈতিক শোষণ আক্ষরিক অর্থে হয়তো কমে না, কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত শোষণ স্পষ্টতই কম অনুভূত হয়। এখন কোন গৃহকর্মীকে চাকর বললে সে গাট্টি প্যাটরা বেঁধে বিদায় নেবে।এখানে তার মর্যাদার প্রশ্ন।

নেকে সামনাসামনি গৃহ কর্মীও বলে না।বলে,আরে এ ইতো আমার ঘর সংসার চালায়। আমার এ মাসি বা মেয়ে না থাকলে আমার অবস্থা যে কি হতো!

চাকর বা চাকরানি, বুয়া এবং গৃহকর্মী শব্দের এ রুপান্তর কেন?

শ্রেণী বৈষম্যের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলেই জেন্ডার বৈষম্যে শব্দ প্রয়োগের বিষয়টিও মাথায় ঢুকবে।

কাজেই শব্দের দ্যোতনা শুধু কাব্যিক বিষয় নয়,সামাজিক মর্যাদারও বিষয়।অফিসের পিওন এখন ম্যাসেঞ্জার।কাজেই জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারও নারীর মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত।

আমি নারী।চমৎকার ছবি আঁকবো।আর আপনি বলবেন মহিলা চিত্রশিল্পী?  আপনি নভেরাকে ভাস্কর বলবেন না মহিলা ভাস্কর বলবেল?

একটি সভায়  জ্ঞান গর্ভ আলোচনায় অংশগ্রহণ কারীরা প্রত্যেকেই আলোচক। এখানে কে নর ও কে নারী বিষয়টি মুখ্য নয়। তার জৈবিক পরিচয় খুঁজে মহিলা আলোচক  হিসেবে পরিচয়  করানো  সভ্যতায় পড়ে না।

মারি কুরি যৌথভাবে দুই দুই বার যৌথ গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েও গবেষিকা আর স্বামী পিয়েরে কুরি একবার নোবেল পুরস্কার পেয়েও গবেষক ও বৈজ্ঞানিক। বিশুদ্ধ বৈয়াকরণগণের মতে মারি কুরি কি তবে স্ত্রীলিঙ্গ বৈজ্ঞানিকা”!   

বাবুর্চি তুর্কি ভাষার শব্দ?এর অর্থ পাচক। বিশুদ্ধ বৈয়াকরণগণ নারীর বেলায় বলেন পাচিকা।নারীর এ উপাধি কিন্তু রন্ধনশিল্পের দক্ষতার জন্য নয়, শুধুমাত্র তার দৈহিক গঠনের জন্য।রাঁধুনী বলতে নারী বুঝায়।ব্যকরণের ভাষায় এটি নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ।এর পুংলিঙ্গ কি রাঁধন করা যায় না?আমার কাছে বাবুর্চির চেয়ে রাঁধন শ্রুতি মধুর লাগছে। এক্ষেত্রে বিশুদ্ধ বৈয়াকরণগণের উত্তর আমার জানা নেই।

নেপথ্যে বলে রাখি--- আমি এসব পেশার বেলায় লিঙ্গান্তরে বিশ্বাসী না। ঈ-প্রত্যয়,নী- প্রত্যয়,আনী- প্রত্যয়,ইনী- প্রত্যয়,উন – প্রত্যয়,আইন- প্রত্যয় ব্যবহার পরিহার করে বেঙ্গম বেঙ্গমী, ভিখারী ভিখারিনী শব্দের যুগের পরিসমাপ্তি প্রয়োজন।

ইংরেজীতে chairman এর পরিবর্তে chairperson শব্দ ব্যবহার অনেক আগেই চালু হয়েছে।বাংলায় সভাপতি ও সভানেত্রী।কিন্তু আমাদের দেশে ইউনিয়ন পরিষদের chairperson পদে কোন নারী নির্বাচিত হলে বলা হয় মহিলা চেয়ারম্যান।চেয়ারম্যানের ম্যান শব্দটি চেয়ারের সাথে আঠা বা গাম দিয়ে লাগানো।তা থেকেই যায়।এ আঠা ছুটাতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নতুন শব্দ সৃষ্টি করা।

chairperson এর মতো বাংলায়ও এমন কিছু শব্দ ব্যবহার চালু আছে। যেমন পোশাক শিল্পে শ্রমিক (garments worker),গৃহকর্মী (house worker)। আরও আছে। 

কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে member নারী পুরুষ নির্বিশেষে। female member বাংলায় সদস্যা।এক্ষেত্রে সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য বলা উচিত। কারণ কোন নারী সংরক্ষিত আসনের বাইরে নির্বাচিত হলে উনি কি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যা বা female member মাত্র। সাধারণভাবে তো সদস্য ও সদস্যাদের(সংররক্ষিত আসনের মেম্বার)পোর্টফোলিও একটু আলাদা।

গ্রামীন সমাজে প্রচলিত ধারণা---- আরে! ইউনিয়ন পরিষদের বেডি মেম্বারগুলি কোন কামের না।কিচ্ছু বুঝে না।এখানে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহারের কি ছিরি!

সংরক্ষিত মহিলা আসনে পুরুষ মেম্বারের চেয়ে তিনগুণ বড় কর্ম এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে পাশ করে এসেও বেডি মেম্বার। কেউ কিন্তু বলে না ইউনিয়ন পরিষদের বেডা মেম্বারগুলি প্রায়ই সরকারি চাল গম চুরি করে।

ছেলে মানুষী কি আদুরে শব্দ!সাত খুন মাফ।ছেলে মানুষী করতে করতে নষ্টামি করলেও দুষ্টামি।তবুও ছেলে মানুষী।

মেয়ে মানুষ!কি তুচ্ছ উচ্চারণ!মেয়ে মানেই অধঃস্তনতা।মেয়ে মানুষের মতো কথা বলা। দুর্বল কথা।অপ্রাসঙ্গিক কথার চর্চা।

আমরা শৈশবে মাকে বলতাম, বান্ধবীর বাড়ি যাবো।কেন যাবো তা ঈ প্রমাণসহ বলতাম।মা অনুমোদন দিলে তবে যাওয়া। আর বন্ধুত্ব সামাজিক সংকীর্ণতার মেয়ের বন্ধু মেয়ে।অনার্সে পড়ার সময় ছেলে বন্ধু হয়েছে এবং এখনও--- ফেসবুক যুগ পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছেীখন মেয়েবলে, বন্ধুর সাহে দেখা করতেযাচ্ছি। সে বন্ধু ছেলে না মেয়ে এ প্রশ্ন অবান্তর। বন্ধুত্ব শব্দটি সামাজিক বলয়ে সম্প্রসারিত এবং বন্ধু শব্দটি লিঙ্গের শিকল থেকে মুক্ত।

শব্দ ব্যবহারে সচেতন হবার সময় বিগত।এখনই জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার শুরু হোক।

 যুগ পালটে গেছে।শব্দ এখন রুপ পাল্টিয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছে।

 


Wednesday, May 27, 2020

ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য (১)


পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লিখেছিলেন একজন নারী।নাম মুরাসাকি সিকিবু  )Murasaki Shikibu) উপন্যাসের নাম দ‍্য টেল অফ গেঞ্জি  )The Tale of Genji) উনি ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন জাপানে একাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে। যে নারী জাতির হাত দিয়ে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস লিখিত, সেই নারীদেরকে সাহিত্যের মূল স্রোত থেকে বের করে দিয়ে নাম দেয়া হয় ঔপন্যাসিকা  লেখালেখি করলে তাকে লেখক না বলে বানানো হয় লেখিকা। নারীরা সাহিত্যে তাদের পরিচয় নিয়েই অবহেলিত। এটা পুরুষতান্ত্রিক অসংবেদনশীল সামাজিক সাংস্কৃতিক মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। অকৃতজ্ঞ সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতাদের সনাতন পন্থী ব্যাকরণবিদদের নারীর প্রতি বিবেচনাবিহীন বিদ্বেষপ্রসূত মনোভাবই অবহেলা লালন করে আসছে। 
আজকের সময়েও অনেকে একজন সৃজনশীল মানুষের জৈবিক লিঙ্গীয় পরিচয়ের অজুহাতে তার সামাজিক লিঙ্গীয় পরিচয়কে অধঃস্তন করে রাখে কাজেই এর প্রতিরোধ প্রয়োজন
ভাষায় ব্যাকরণে লিঙ্গবৈষম্য রয়েছে। এজন্য জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার নিয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

ব্যাকরণে সব পুংলিঙ্গ শব্দসমূহের স্ত্রী লিঙ্গান্তরের কথা বলা হচ্ছে না। যেমন--মা-- বাবা এখানে মা বাবার ভূমিকা আলাদা। তাই বলে উভয়লিঙ্গ শব্দগুলোকে জোর করে লিঙ্গান্তর বা স্ত্রীলিঙ্গ না করারই কথা বলা হচ্ছে।

আমার উপরের ফেইসবুক পোস্টটিতে অনেক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে প্রতিক্রিয়ার প্রায় সবগুলোই দ্বিমত পোষণ করে প্রতিক্রিয়াগুলো বিভাজন করলে যাদেরকে পাই তারা হলেন:
·       ভাষায় ব্যাকরণে লিঙ্গীয় বৈষম্য নিয়ে একেবারের বি সি না জানা পর্যায়ের 
·       ভাষায় ব্যাকরণে পান্ডিত্য জাহির করে লিঙ্গীয় বৈষম্যের বিষয়টি ভাষায় ব্যাকরণে প্রযোজ্য নয় বলে রাজ্যের যুক্তি দেয়া লোকজন 
·       দুয়েকজনের মন্তব্যের প্রতি উত্তরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট দেখিয়ে যুক্তি দিয়েছি বলে আমাকে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ করছি বলে গাল মন্দ করতেও ছাড়েননি 
·        সনাতনপন্থী্দের ব্যাকরণের কিছু কিছু উদাহরণের বিপরীতে আমার যুক্তিকে কট্টরভাবে বাংলা ভাষারজাত গেল জাত গেল বলে দোহাই ঝেড়েছেন।
·        দুয়েকজন মাত্র আমার কিছু কিছু ব্যাখ্যা মেনে নেয়ার মনোভাব দেখিয়েছেন
আমি ধৈর্যের সাথে সবার মতামতকেই প্রতি উত্তর করেছিকারণ ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য দূরীকরণে প্রত্যেকের গু্রুত্ব ভূমিকা রয়েছেকারণ মন্তব্যকারীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বসবাস করে এবং তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে মতামত দিয়ে লিঙ্গীয় বৈষম্যকে জিইয়ে রাখেকাজেই তাদের মন্তব্যগুলো  ইন্টারনেটে গুরুত্বহীনভাবে এড়িয়ে গেলেও সমাজে তা সম্ভব নয়
  আমি সে সব প্রশ্নোত্তর থেকে একটু সম্পাদনা করে লেখাটি সাজিয়েছি।
একজনের যুক্তি ছিলঃ সুচিত্রা সেনকে নায়িকা না বলে নায়ক বললে কি তাঁর গৌরব বাড়বে? তেমনি কোন নারী কিছু লিখলে উনি লেখিকা, লেখক নয়।
আমার উত্তর ছিলঃ সুচিত্রা সেন তো নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কাজেই তাঁর লিঙ্গীয় পরিচয় নায়িকা।  সুচিত্রা সেনকে পর্দায় দেখলে নারীই বলবো
 নায়িকা হতে  নারীর শারীরিক কাঠামো লাগে, লেখক হতে লাগে না।

কিন্তু যিনি লিখেন তিনি লেখক। কাগজে বা নেটে নামবিহীন কোন লেখা গল্প বা উপন্যাস পড়ে লেখাটি নারী না পুরুষের তা বলা অসম্ভব।যিনি কবিতা লিখেন তিনি কবি। নারী বলে মহিলা কবি পরিচয় নয়।অভিনয়ে নারী চরিত্রের মতো লেখার জন্য বিশেষ কোন বেশভূষা বা লিঙ্গীয় বিষয় বয়ে বেড়াতে হয় না। হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করি, মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা করি আর আঙ্গুল দিয়ে লিখি। নারী পরিচয় বহনকারী প্রজনন কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কোন ভূমিকা লেখায় প্রতিফলিত হয় না। কাজেই লেখক, উপন্যাসিক, কবি উভয় লিঙ্গবাচক শব্দ।

আরেকজন বললেনঃ লেখিকা বা ঔপন্যাসিকা পরিচয় না মানা পশ্চিমী ইংরেজির অন্ধ (বিশেষ করে আমেরিকার)অনুকরণ (উনিহনুকরণশব্দটি বার বার কটূভাবে ব্যবহার করেছেন) মাত্র যা বাংলা ভাষায় মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়।
জেন্ডার অসংবেদনশীলতার মাত্রা কোন পর্যায়ে গেলে হনুকরণ ব্দটি ব্যবহার করেছেন তা সহজেই অনুমেয়।
আমি প্রতি উত্তর করেছিলামঃ পশ্চিমী ভাষায় শব্দ ব্যবহার মানেই জেন্ডার সংবেদনশীল নয়। ইরেজিতে she এবং he আছে, কিন্তু আমরা সে বা তিনি বলি। gender neutral শব্দ ব্যবহার করি। আমরা কিন্তু পশ্চিমকে অনুসরণ করে বাংলায় she এবং he এর লিঙ্গভিত্তিক প্রতিশব্দ খুঁজছি না। তাছাড়া সে এবং তিনি যেমন স্ত্রী এবং পুরুষবাচক উভয় ক্ষেত্র ব্যবহার করছি। তেমন কবি, লেখক ঔপন্যাসিক শব্দও নারী পুরুষ  উভয়ের বেলায় প্রযোজ্য। ভাস্কর শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ কি হবে!
উনি এটাও বললেনঃ কোন নারীকে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিলে বাংলা ব্যাকরণের শুদ্ধতা নষ্ট হবে।
আমার প্রশ্ন ছিলঃ তাহলে নারী প্রধানমন্ত্রী হলে পদের নাম কি মহিলা প্রধান মন্ত্রী?
অবশ্য এর উত্তরে কিছু আবোলতাবোল যুক্তি ছিল, যা এখানে উল্লেখ করলে প্যাঁচাল বুঝাবে।
 সনাতনপন্থী ভারতীয়  বৈয়াকরণকে বুঝতে অক্ষম যে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধান মন্ত্রী অথবা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাদের পদের নাম মহিলা প্রধান মন্ত্রী নয়। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর খবর  হবে ভারতের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধান মন্ত্রী। তাই বলে উনার পদের নাম পাল্টে নিত্য দিনের খবরে কিন্তু এটা বলবে না যে, মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী  রাষ্ট্রীয় সফরে  বাংলাদেশে আসছেন। 
ওই ভারতীয় ব্যক্তিটিকে প্রশ্ন করেছিলাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে  প্রতিমা পাটিল এর পরিচয় কি হবে?  নারী  রাষ্ট্রপতি? রাষ্ট্রপত্নী?  যাহোক, উনি আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু ব্যকরণ কপচেছেন পশ্চিমাহনুকরণ”  মানে অনুকরণ শব্দটি  অশালীনভাবে বার বার ব্যবহার করেছেন গালি দিয়েছেন।
  দীর্ঘ  বিতর্কে সময় শ্রম ব্যয় করেও বুঝানো যায়নি। সজাগ থেকে ঘুমের ভান করলে তো আর জাগানো সম্ভব নয়।
  উদাহরণ দিয়েছি----  আমি নারী সে আমার দু'একটি প্রজনন বিষয়ক। আমি মানুষ, মহিলা মানুষ না। আমি কবি, মহিলা কবি না। কবিতায় আমি এমন কোন শব্দ ব্যবহার করিনা  যেখানে আমার প্রজনন পরিচিতি প্রতিফলিত হয়।  আমি বাঙালি, বাঙালিনী না।
সনাতনপন্থীরা গবেষিকা শব্দও নারী গবেষকদের বেলায় ব্যবহার করে।
কোন নারী পাইলট এর বেলায় কী হবে?
এমন অনেক পেশার নাম বলা যাবে। অনেক সৃষ্টিকর্মের কথা কথা বলা যাবে যা উভয়বাচক হিসেবেই সম্বোধন করা উচিত।
র্বোপরি, নারীর প্রতি শব্দ ব্যবহারে  লিঙ্গীয় বৈষম্যের অনেক দিক রয়েছে। আজ একটি দিকমাত্র আলোচনা করা হলো। আর এর অবসানে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের সাথে সামাজিক আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে।