Wednesday, May 27, 2020

ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য (১)


পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লিখেছিলেন একজন নারী।নাম মুরাসাকি সিকিবু  )Murasaki Shikibu) উপন্যাসের নাম দ‍্য টেল অফ গেঞ্জি  )The Tale of Genji) উনি ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন জাপানে একাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে। যে নারী জাতির হাত দিয়ে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস লিখিত, সেই নারীদেরকে সাহিত্যের মূল স্রোত থেকে বের করে দিয়ে নাম দেয়া হয় ঔপন্যাসিকা  লেখালেখি করলে তাকে লেখক না বলে বানানো হয় লেখিকা। নারীরা সাহিত্যে তাদের পরিচয় নিয়েই অবহেলিত। এটা পুরুষতান্ত্রিক অসংবেদনশীল সামাজিক সাংস্কৃতিক মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। অকৃতজ্ঞ সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতাদের সনাতন পন্থী ব্যাকরণবিদদের নারীর প্রতি বিবেচনাবিহীন বিদ্বেষপ্রসূত মনোভাবই অবহেলা লালন করে আসছে। 
আজকের সময়েও অনেকে একজন সৃজনশীল মানুষের জৈবিক লিঙ্গীয় পরিচয়ের অজুহাতে তার সামাজিক লিঙ্গীয় পরিচয়কে অধঃস্তন করে রাখে কাজেই এর প্রতিরোধ প্রয়োজন
ভাষায় ব্যাকরণে লিঙ্গবৈষম্য রয়েছে। এজন্য জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার নিয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

ব্যাকরণে সব পুংলিঙ্গ শব্দসমূহের স্ত্রী লিঙ্গান্তরের কথা বলা হচ্ছে না। যেমন--মা-- বাবা এখানে মা বাবার ভূমিকা আলাদা। তাই বলে উভয়লিঙ্গ শব্দগুলোকে জোর করে লিঙ্গান্তর বা স্ত্রীলিঙ্গ না করারই কথা বলা হচ্ছে।

আমার উপরের ফেইসবুক পোস্টটিতে অনেক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে প্রতিক্রিয়ার প্রায় সবগুলোই দ্বিমত পোষণ করে প্রতিক্রিয়াগুলো বিভাজন করলে যাদেরকে পাই তারা হলেন:
·       ভাষায় ব্যাকরণে লিঙ্গীয় বৈষম্য নিয়ে একেবারের বি সি না জানা পর্যায়ের 
·       ভাষায় ব্যাকরণে পান্ডিত্য জাহির করে লিঙ্গীয় বৈষম্যের বিষয়টি ভাষায় ব্যাকরণে প্রযোজ্য নয় বলে রাজ্যের যুক্তি দেয়া লোকজন 
·       দুয়েকজনের মন্তব্যের প্রতি উত্তরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট দেখিয়ে যুক্তি দিয়েছি বলে আমাকে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ করছি বলে গাল মন্দ করতেও ছাড়েননি 
·        সনাতনপন্থী্দের ব্যাকরণের কিছু কিছু উদাহরণের বিপরীতে আমার যুক্তিকে কট্টরভাবে বাংলা ভাষারজাত গেল জাত গেল বলে দোহাই ঝেড়েছেন।
·        দুয়েকজন মাত্র আমার কিছু কিছু ব্যাখ্যা মেনে নেয়ার মনোভাব দেখিয়েছেন
আমি ধৈর্যের সাথে সবার মতামতকেই প্রতি উত্তর করেছিকারণ ভাষায় লিঙ্গীয় বৈষম্য দূরীকরণে প্রত্যেকের গু্রুত্ব ভূমিকা রয়েছেকারণ মন্তব্যকারীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বসবাস করে এবং তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে মতামত দিয়ে লিঙ্গীয় বৈষম্যকে জিইয়ে রাখেকাজেই তাদের মন্তব্যগুলো  ইন্টারনেটে গুরুত্বহীনভাবে এড়িয়ে গেলেও সমাজে তা সম্ভব নয়
  আমি সে সব প্রশ্নোত্তর থেকে একটু সম্পাদনা করে লেখাটি সাজিয়েছি।
একজনের যুক্তি ছিলঃ সুচিত্রা সেনকে নায়িকা না বলে নায়ক বললে কি তাঁর গৌরব বাড়বে? তেমনি কোন নারী কিছু লিখলে উনি লেখিকা, লেখক নয়।
আমার উত্তর ছিলঃ সুচিত্রা সেন তো নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কাজেই তাঁর লিঙ্গীয় পরিচয় নায়িকা।  সুচিত্রা সেনকে পর্দায় দেখলে নারীই বলবো
 নায়িকা হতে  নারীর শারীরিক কাঠামো লাগে, লেখক হতে লাগে না।

কিন্তু যিনি লিখেন তিনি লেখক। কাগজে বা নেটে নামবিহীন কোন লেখা গল্প বা উপন্যাস পড়ে লেখাটি নারী না পুরুষের তা বলা অসম্ভব।যিনি কবিতা লিখেন তিনি কবি। নারী বলে মহিলা কবি পরিচয় নয়।অভিনয়ে নারী চরিত্রের মতো লেখার জন্য বিশেষ কোন বেশভূষা বা লিঙ্গীয় বিষয় বয়ে বেড়াতে হয় না। হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করি, মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা করি আর আঙ্গুল দিয়ে লিখি। নারী পরিচয় বহনকারী প্রজনন কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কোন ভূমিকা লেখায় প্রতিফলিত হয় না। কাজেই লেখক, উপন্যাসিক, কবি উভয় লিঙ্গবাচক শব্দ।

আরেকজন বললেনঃ লেখিকা বা ঔপন্যাসিকা পরিচয় না মানা পশ্চিমী ইংরেজির অন্ধ (বিশেষ করে আমেরিকার)অনুকরণ (উনিহনুকরণশব্দটি বার বার কটূভাবে ব্যবহার করেছেন) মাত্র যা বাংলা ভাষায় মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়।
জেন্ডার অসংবেদনশীলতার মাত্রা কোন পর্যায়ে গেলে হনুকরণ ব্দটি ব্যবহার করেছেন তা সহজেই অনুমেয়।
আমি প্রতি উত্তর করেছিলামঃ পশ্চিমী ভাষায় শব্দ ব্যবহার মানেই জেন্ডার সংবেদনশীল নয়। ইরেজিতে she এবং he আছে, কিন্তু আমরা সে বা তিনি বলি। gender neutral শব্দ ব্যবহার করি। আমরা কিন্তু পশ্চিমকে অনুসরণ করে বাংলায় she এবং he এর লিঙ্গভিত্তিক প্রতিশব্দ খুঁজছি না। তাছাড়া সে এবং তিনি যেমন স্ত্রী এবং পুরুষবাচক উভয় ক্ষেত্র ব্যবহার করছি। তেমন কবি, লেখক ঔপন্যাসিক শব্দও নারী পুরুষ  উভয়ের বেলায় প্রযোজ্য। ভাস্কর শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ কি হবে!
উনি এটাও বললেনঃ কোন নারীকে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিলে বাংলা ব্যাকরণের শুদ্ধতা নষ্ট হবে।
আমার প্রশ্ন ছিলঃ তাহলে নারী প্রধানমন্ত্রী হলে পদের নাম কি মহিলা প্রধান মন্ত্রী?
অবশ্য এর উত্তরে কিছু আবোলতাবোল যুক্তি ছিল, যা এখানে উল্লেখ করলে প্যাঁচাল বুঝাবে।
 সনাতনপন্থী ভারতীয়  বৈয়াকরণকে বুঝতে অক্ষম যে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধান মন্ত্রী অথবা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাদের পদের নাম মহিলা প্রধান মন্ত্রী নয়। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর খবর  হবে ভারতের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধান মন্ত্রী। তাই বলে উনার পদের নাম পাল্টে নিত্য দিনের খবরে কিন্তু এটা বলবে না যে, মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী  রাষ্ট্রীয় সফরে  বাংলাদেশে আসছেন। 
ওই ভারতীয় ব্যক্তিটিকে প্রশ্ন করেছিলাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে  প্রতিমা পাটিল এর পরিচয় কি হবে?  নারী  রাষ্ট্রপতি? রাষ্ট্রপত্নী?  যাহোক, উনি আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু ব্যকরণ কপচেছেন পশ্চিমাহনুকরণ”  মানে অনুকরণ শব্দটি  অশালীনভাবে বার বার ব্যবহার করেছেন গালি দিয়েছেন।
  দীর্ঘ  বিতর্কে সময় শ্রম ব্যয় করেও বুঝানো যায়নি। সজাগ থেকে ঘুমের ভান করলে তো আর জাগানো সম্ভব নয়।
  উদাহরণ দিয়েছি----  আমি নারী সে আমার দু'একটি প্রজনন বিষয়ক। আমি মানুষ, মহিলা মানুষ না। আমি কবি, মহিলা কবি না। কবিতায় আমি এমন কোন শব্দ ব্যবহার করিনা  যেখানে আমার প্রজনন পরিচিতি প্রতিফলিত হয়।  আমি বাঙালি, বাঙালিনী না।
সনাতনপন্থীরা গবেষিকা শব্দও নারী গবেষকদের বেলায় ব্যবহার করে।
কোন নারী পাইলট এর বেলায় কী হবে?
এমন অনেক পেশার নাম বলা যাবে। অনেক সৃষ্টিকর্মের কথা কথা বলা যাবে যা উভয়বাচক হিসেবেই সম্বোধন করা উচিত।
র্বোপরি, নারীর প্রতি শব্দ ব্যবহারে  লিঙ্গীয় বৈষম্যের অনেক দিক রয়েছে। আজ একটি দিকমাত্র আলোচনা করা হলো। আর এর অবসানে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের সাথে সামাজিক আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে।